আম্মা: মিড-ডে মিল কর্মীদের লড়াইয়ের এক নাম

জুবি সাহা

(নারী ও সমাজ আন্দোলন কর্মী)


নগনে আঁচের সামনে চোখমুখ ঝলসে যায়, কিন্তু কাজে এতটুকু ঢিলে দিলে হয় না, সমানে হাত চলতে থাকে। সময়ের মধ্যে বাচ্চাদের খাবারটা রেডি করে না দিলে ওরা শুকনোমুখে অপেক্ষা করবে। সকাল থেকে কাজ শুরু হয়। দোকান থেকে মালপত্তর নিয়ে আসা, সবজি কাটা, উনুন ধরানো, রান্না শেষ করে সমস্ত বাসনপত্র, রান্নাঘর ধোয়ামোছা করে কাজ শেষ হয়। এর বাইরেও কিছু কাজ থাকে, যেমন কখনো বাচ্চাদের খাইয়ে দেওয়া, বাথরুম পরিষ্কার করা, জ্বালানির কাঠ জোগাড়, সেগুলোকে মাঝেমধ্যে রোদে দেওয়া, স্যার-ম্যাডামদের চা করে দেওয়া। রোজ ৪ টাকা ৯৭ পয়সায় (জ্বালানির খরচ সহ) বাচ্চাদের 'পুষ্টিকর' খাবার বানিয়ে দেন, বড়দের ৭ টাকা ৪৫ পয়সা। খাবার ভালো হয় না বলে অভিভাবকদের অভিযোগ শুনতে হয়, অনেকের চোখে 'চোর' হয়ে যেতে হয়।

    ২০০৪ সাল থেকে এভাবেই কাজ করে যাচ্ছেন স্কুলের মিড-ডে মিল কর্মীরা। কিভাবে শুরু হয় মিড-ডে মিল? ২০০১ সালে পিইউসিএল (পিপল'স ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবারটিজ) সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা করেন। তাঁরা দেখালেন যে সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার গোডাউনে যে পরিমাণ খাদ্যশস্য সঞ্চিত আছে তার বস্তাগুলোকে একটার ওপর আরেকটা রাখলে পৃথিবী থেকে চাঁদের যা দুরত্ব তার আড়াই গুণ উঁচু একটা স্তম্ভ তৈরি হয়ে যায়। 'খাদ্যের অধিকার' সুনিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট তখন অবিলম্বে সমস্ত প্রাইমারি স্কুলে মিড-ডে মিল চালু করার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশিকা অনুসারে পশ্চিমবঙ্গে ২০০৪ সাল থেকে মিড-ডে-মিল দেওয়া শুরু হল। পৌরসভা সহ কিছু এলাকা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের মিড-ডে মিলের রান্না করেন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা। ২০০৪ সালে একটি পোস্টে মাইনে ছিল ২০০ টাকা এবং ছাত্র পিছু ১০ পয়সা, অর্থাৎ স্কুলে ১০০ জন ছাত্রছাত্রী থাকলে ২১০ টাকা, যা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে ভাগ হয়ে যেত। পরে ৩০০ থেকে ৫০০ - এভাবে ধাপে ধাপে সেটা বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১৫০০ টাকা, অর্থাৎ দিনে ৫০ টাকা। স্বনির্ভর গোষ্ঠী সদস্যদের মধ্যে সেটা ভাগ হয়ে গিয়ে দাঁড়ায় দিনে গড়ে ১০-১২ টাকা। তাও বছরে দু'মাস মাইনে বন্ধ থাকে। মাইনে আসে ৩-৪ মাস অন্তর, তাও হেডস্যারের একাউন্টে। নেই কোনো মাতৃত্বকালীন ছুটি, উৎসবকালীন বোনাস, অবসরকালীন ভাতা, দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার। ১৮ বছর এভাবে কাজ করার পরেও নেই কোনো সরকারি স্বীকৃতি।

    ২০২০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট একটি মামলায় মিড-ডে মিল কর্মীদের দিয়ে 'বেগার খাটানো' হচ্ছে বলে ঘোষণা করেন এবং অবিলম্বে ন্যূনতম মজুরি আইন, ১৯৪৮ অনুসারে মিড-ডে মিল কর্মীদের বেতনকাঠামোকে সরকারি ন্যূনতম মজুরির আওতায় নিয়ে আসা এবং সেই অনুসারে বিগত ১৫ বছরের বকেয়া মজুরি মেটানোর নির্দেশ দেন। কাজ অনুসারে মিড-ডে মিলে রান্নার কাজ অন্ততপক্ষে সেমি-স্কিলড কাজের আওতায় আসার কথা এবং সেই অনুযায়ী ন্যূনতম মজুরিও স্থির হওয়ার কথা। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের রান্নাঘরে যাতায়াত থাকে বলে তা চর্চিত হয় না এবং মজুরি তার ধারকাছ দিয়েও যায় না। 'ওয়ান নেশন, ওয়ান রেশন' -এর দেশে মিড ডে মিল কর্মীদের বেতনে ব্যাপক বৈষম্য দৃশ্যমান। যেমন, পন্ডিচেরিতে ২১০০০ টাকা, তামিলনাড়ুতে ১২০০০ টাকা, কেরালায় ৯০০০ টাকা আর পশ্চিমবঙ্গে ১৫০০ টাকা।

    এই বঞ্চনার প্রেক্ষাপটে লকডাউনের সময় শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থার ওপর একটি সার্ভে করতে গিয়ে 'শান্তিপুর জনউদ্যোগ'- এর সাথীদের সাথে নদিয়ার শান্তিপুরের মিড-ডে মিল দিদিদের পরিচয় ঘটে এবং সেখান থেকেই মিড-ডে মিল কর্মীদের নিজস্ব সংগঠন মিড-ডে মিল সহায়িকা সমিতি বা Association of Mid-Day Meal Assistants, সংক্ষেপে AMMA-র পথ চলা শুরু। স্কুলে মায়ের দায়িত্ব পালন করেন তাঁরা, তাই সংগঠনের নামেও সেই ছাপ স্পষ্ট। ২৭শে জানুয়ারি, ২০২২ নদীয়া জেলাশাসকের কাছে বিক্ষোভ মিছিল এবং ডেপুটেশন, ১২ই জুন শান্তিপুরে মিছিল এবং 'আম্মা'র প্রথম সম্মেলন। সম্মেলন থেকে সিদ্ধান্ত হয়, 'আম্মা' কখনো কোনো রাজনৈতিক পার্টি বা এনজিও-র পেছনে গিয়ে দাঁড়াবে না, বরং নিজেকে মিড-ডে মিল কর্মীদের একটি শক্তিশালী ইউনিয়ন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাবে।

    এই লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় গত ২৮শে সেপ্টেম্বর উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার ৪৯টি গ্রাম পঞ্চায়েত এবং পুরসভার কয়েক হাজার মিড-ডে মিল কর্মী

    বারাসাত কাছারি ময়দান থেকে শুরু করে যশোর রোড ধরে হসপিটাল হয়ে সাড়ে ছয় কিলোমিটার লম্বা রাস্তায় মিছিল করলেন। বিক্ষোভ মিছিল করে জেলাশাসকের কাছে ডেপুটেশন জমা দিলেন। দাবি জানালেন সরকারি কাজের স্বীকৃতির। এই মিছিলে যাতে তাঁরা না আসতে পারেন সেজন্য বিভিন্ন এলাকায় চলেছে রাজনৈতিক নেতা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হুমকি। মিছিলে গেলে কাজ থেকে সরিয়ে নতুন গ্রুপকে ঢুকিয়ে দেওয়ার, এক মাসের মাইনে কেটে নেওয়ার, মারধর করার হুমকি। এই সমস্ত হুমকির জোর কতটা এই মিছিল তার উত্তর।

    আম্মার দাবিসমূহে প্ৰথম স্থান পেল মায়েদের নয়, বাচ্চাদের কথা। দাবিগুলো ছিল এইরকম:

    ১. অবিলম্বে স্কুলে মিড ডে মিলে বাচ্চাদের জন্য বরাদ্দ টাকা বৃদ্ধি করতে হবে। বাচ্চাদের রোজ ডিম দিতে হবে।

   ২. অবিলম্বে মিড-ডে মিল কর্মীদের মজুরি সরকারের বেঁধে দেওয়া ন্যূনতম মজুরির অনুপাতে বৃদ্ধি করতে হবে। মিড ডে মিল কর্মীদের সরকারি নিয়োগপত্র দিতে হবে।

  ৩. ১০ মাসের পরিবর্তে মাসের বেতন নিয়মিত আমাদের একাউন্টেই দিতে হবে।

     ৪. উৎসবকালীন বোনাস দিতে হবে।

  ৫. সরকারি সমস্ত ক্ষেত্রের মত মিড-ডে মিল কর্মীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি দিতে হবে।

  ৬. কাজের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে তার চিকিৎসার ব্যয় ও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

   ৭. কর্মরত অবস্থায় মারা গেলে পরিবারের একজনকে কাজে নিয়োগ করতে হবে।

     ৮. কর্মক্ষমতা চলে গেলে এককালীন অর্থ দিতে হবে।

   ৯. কাঠ বা গোবরলাঠি নয়, গ্যাসে রান্নার পরিকাঠামো তৈরি করতে হবে।

     ১০. অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নয়, সকল শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের মিড-ডে মিল দিতে হবে।

  'আম্মা'র মতো দেশজোড়া বিভিন্ন সংগঠন এবং গণ-আন্দোলনকর্মীদের চাপে কেন্দ্র সরকার বাচ্চাদের খাবারের বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করেছে। প্রাইমারিতে বরাদ্দ ছাত্রপিছু ৫.৪৫ টাকা এবং আপার-প্রাইমারিতে ৮.১৭ টাকা। বৃদ্ধির হার ৯.৬ শতাংশ। এই বরাদ্দও পুষ্টিকর খাবারের জন্য অপ্রতুল। এখনো অনেক পথ চলা বাকি। লকডাউনের পর দেশের অধিকাংশ মানুষ যেভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এই লড়াই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা সার্বিক শিক্ষা-স্বাস্থ্যের লড়াই, নারী শ্রমিকের লড়াই, শিশুদের ভবিষ্যতের লড়াই। সহ-নাগরিক হিসেবে এই লড়াইকে শক্তিশালী করা সকলের কর্তব্য।