ধর্মের কল বাতাসে নড়ে
ডাঃ দেবজিৎ গোপ
অনেকে আজ ইন্টারনেট পরিষেবা ফিরে পেয়ে খুবই খুশি,আবার আজ তারা সাম্প্রদায়িক লেখা শুরু করবে, ধর্মীয় উস্কানি দিতে শুরু করবে -
"সনাতনীরা তোমরা দেখ, মুসলিমরা কীভাবে অত্যাচার করছে আমাদের হিন্দু ভাইদের উপর" "মুসলিম ভাইরা তোমরা দেখ, হিন্দুরা কীভাবে অত্যাচার করছে আমাদের মুসলিম ভাইদের উপর "- এসব তো এখনকার স্বাভাবিক পোস্ট হয়ে গেছে। এদের লজ্জা করে না এরকম কিছু লিখতে। সত্যি বলতে সামাজিক মাধ্যমে কী সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক পোস্ট দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও কেউ তার ধার ধারে না।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যাপারটা হলো এরকম -
[রাম রহিম খুবই ভালো বন্ধু, কিন্তু লোকে বলাবলি করছে - "জানিস জানিস রাম রহিমের খুবই ঝগড়া ,একে অপরের মুখ দেখাদেখি নেই"। রাম রহিম নিজেদের ঝগড়া হয়েছে এটাই জানত না, একদিন হঠাৎ লোকে-মুখে (পড়ুন মিডিয়া ও রাজনৈতিক ফলভোগী) শুনে তো আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা , পরে জানা গেল নাকি রাম রহিম যেখানে থাকে সেই চত্বরে দুই রাজনৈতিক দলের ঝামেলা হয়েছিল , সেটাকে ঢাকতে এটা প্রচার করা হয়েছে।]
আসলে সত্যিই এখন রাজনৈতিক অপকীর্তি ঢাকতে দলগুলির সবথেকে শক্তিশালী হাতিয়ার হল নিউজ চ্যানেল গুলির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে দেওয়া, আর সত্যিই মানুষজনের সব সময় সেনসিটিভ ফেক ইস্যু চাই ,ব্যাস এবার ওটা নিয়ে মাতামাতি করবে। ওয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে বিষ ছড়াবে।
ভেবে দেখলেও হাসি লাগে কারা এই পোস্ট করছে এরা তারা, যারা নিজেদেরকে সনাতনী বলে দাবী করছে এদিকে তারা কোনোদিন ও গীতা পড়েদেখার সময় পায়নি, এরা তারা যারা নিজেদেরকে মুসলিম বলে দাবী করেছে যাদের কোনোদিনও কোরআন খুলে পড়ার ইচ্ছা হয়নি। এরা আবার বলে সনাতনী হয়ে সনাতনকে রক্ষা করব না? মুসলিম হয়ে ইসলামকে রক্ষা করব না? ভীষণ হাসি পায়।
সত্যিই কটা মানুষ এখন ধর্মকে জানে?একটা প্রচলিত কথা আছে -
" পৃথিবীতে যাহা কিছু ধর্ম নামে চলে,
ভাগবত কহে তাহা পরিপূর্ণ 'ছলে'।"
মানে যে ইসলাম সৃষ্টির শুরু থেকে আছে , যে সনাতন সৃষ্টির শুরু থেকে আছে - তারা এখন ও থাকবে , সৃষ্টির শেষ পর্যন্ত থাকবে। কিন্তু এই সৃষ্টির পরিকল্পিত ধ্বংসলীলায় মেতে উঠেছি আমরা। আমাদের উচিত প্রকৃত সনাতনী হওয়া ,যে নিজস্ব ভগবানের কথা চিন্তা করে। আমাদের উচিত প্রকৃত মুসলিম হওয়া , যে নিজের আল্লাহর ইবাদত করে। আজ ,এই ধ্বংসলীলা তখনই থামবে যখন আমরা নিজেকে বুঝবো, উপলব্ধি করব। বদলাব।
আমরা অপরকে বদলাতে পারি না, আমাদের নিয়ন্ত্রণ শুধু নিজের ভেতর।
আজ,এই ধ্বংসলীলা তখনই থামবে যখন- এক মুসলিম অন্য মুসলিমের সনাতন হিংসা কে থামাবে, এক সনাতনী অন্য সনাতনীর মুসলিম হিংসা কে থামাবে। যখন সবাই হৃদয় থেকে বলে উঠবে - "মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। / মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ॥" সেদিন আমরা প্রকৃত সনাতনী আর প্রকৃত মুসলিম হতে পারব।
তাই তো ভারতকে জানতে গেলে স্যার ডঃ এ.পি.জে. আবদুল কালাম কে পড়া উচিৎ, বোঝা উচিৎ স্বামীজি কে ,পড়া উচিৎ নেতাজি। তাদের সময়ে কি হিন্দু মুসলিম বিভেদ হয়নি? কিন্তু সবসময় তারা ঐক্যের কথা বলে গেছেন। সৃষ্টিতে যত মহামানব এসেছেন সবাই ঐক্যের কথা বলে গেছেন। তাহলে আমাদের মনে কীসের এত দ্বন্দ্ব, কিসের হিংসা ?
সাম্প্রদায়িক পোস্ট এর মত হয়ত এই লেখা ভাইরাল হবে না , কিন্তু যারাই এই লেখা দেখবে , তাদের ভেতর এই প্রশ্নের উদয় হোক-" আমাদের মনে কেন এত হিংসা?"

